ওয়াশিংটন: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন সাবেক মিস সুইজারল্যান্ড প্রতিযোগী ও মডেল বিয়াট্রিস কিউল। তাঁর অভিযোগ, ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে নিউইয়র্কের প্লাজা হোটেলে তাঁকে ধর্ষণ করেন ট্রাম্প। সম্প্রতি মার্কিন ডেমোক্র্যাটদের একটি তদন্তকারী দলের কাছে দেওয়া বক্তব্যের বরাতে অভিযোগটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে একে ‘ভুয়া খবর’ বলে আখ্যা দিয়েছে হোয়াইট হাউস।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনের বরাতে দৈনিক ইত্তেফাক জানিয়েছে, সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে কিউলের অভিযোগের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। ঘটনাটি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ভিসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রতিশ্রুতির অভিযোগ
ডেমোক্র্যাটিক কমিটির কর্মীদের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহের সাক্ষাৎকারে কিউল ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের কথা জানান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তখন তাঁর বয়স ছিল ২৪ বছর। ট্রাম্প তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা এবং নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি তোমার যত্ন নেব।’
কিউলের অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে ট্রাম্পের এক প্রতিনিধি তাঁকে প্লাজা হোটেলের ওপরের তলায় ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করতে নিয়ে যান।
‘জোরপূর্বক ধর্ষণ’, দাবি তদন্ত প্রতিবেদনে
প্রতিবেদনে কিউলের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, হোটেলে প্রবেশের পর ট্রাম্প তাঁকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। এ সময় তাঁর পোশাক ছিঁড়ে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্তপাত ও আঘাতের চিহ্ন তৈরি হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
কিউল ঘটনাটিকে ‘নৃশংস’ বলে বর্ণনা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর দাবি, ঘটনার পর ট্রাম্প তাঁকে বিছানার ধারে বসিয়ে আবারও ভিসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রতিশ্রুতি দেন। একই সঙ্গে তাঁকে চুপ থাকতে বলে ‘শো চলতেই হবে’—এমন কথাও বলেছিলেন বলে অভিযোগ কিউলের।
এসব তথ্য কিউলের অভিযোগ ও তদন্ত প্রতিবেদনে উপস্থাপিত বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার মতো তথ্য প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়।
২০২৪ সালেও অভিযোগ তুলেছিলেন কিউল
এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণের অভিযোগ তুলেছিলেন কিউল।
তখন তাঁর বক্তব্য ছিল, ট্রাম্প তাঁকে ঠোঁটে ও ঘাড়ে চুমু দিয়েছিলেন, পোশাক তোলার চেষ্টা করেছিলেন এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শ করেছিলেন। তবে ওই সাক্ষাৎকারে কিউল বলেছিলেন, কথা বলে তিনি পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছিলেন।
ডেইলি মেইলের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছিল, ঘটনার প্রায় ২০ বছর আগেই কিউল তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়। সে সময় ট্রাম্পের তৎকালীন প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট অভিযোগটি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
অ্যাপস্টাইন-যোগ নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের বিস্ফোরক দাবি
প্রতিবেদনে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের জুডিশিয়ারি কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য জেমি রাসকিনের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, পাঁচজন নারী জেফরি অ্যাপস্টাইনের উপস্থিতিতে বা তাঁর সান্নিধ্যে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণ কিংবা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এনেছেন। অন্য নারীদের ক্ষেত্রেও অ্যাপস্টাইন বা গিসলেন ম্যাক্সওয়েলের মাধ্যমে তাঁদের ট্রাম্পের কাছে পাচারের চেষ্টা হয়েছিল বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে—এমন দাবি করেন তিনি।
রাসকিন আরও অভিযোগ করেন, প্রেসিডেন্টকে রক্ষা করতে ট্রাম্পের বিচার বিভাগ এসব অপরাধ ধামাচাপা দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এটি তাঁর রাজনৈতিক ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট বক্তব্য; অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত হিসেবে একে দেখা যাবে না।
অভিযোগ অস্বীকার হোয়াইট হাউসের
কিউলের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে হোয়াইট হাউস। তাদের বক্তব্য, এটি ‘ভুয়া খবর’। হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র দাবি করেন, ট্রাম্প অ্যাপস্টাইন-সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন।
ডেমোক্র্যাটদের প্রকাশিত প্রতিবেদনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও আখ্যা দিয়েছে হোয়াইট হাউস। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের সাফল্যের কারণে রিপাবলিকানদের ঊর্ধ্বমুখী রাজনৈতিক অবস্থান থেকে মার্কিন জনগণের মনোযোগ সরাতেই ডেমোক্র্যাটরা এমন চেষ্টা করছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নতুন রাজনৈতিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ায় বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ৩ নভেম্বরের নির্বাচন সামনে রেখে অ্যাপস্টাইন-সংক্রান্ত নথি ব্যবস্থাপনা এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ে বিতর্ক রিপাবলিকান প্রার্থীদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অভিযোগের রাজনৈতিক প্রভাব যা-ই হোক, এর সত্যতা নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট নথি এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়াই হবে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ; দৈনিক ইত্তেফাক।