টাঙ্গাইলের ‘হানি কুইন’ খ্যাত মধুপুরের আনারস এবার রপ্তানী হচ্ছে বিশ্ব বাজারে। ইতোমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশে রপ্তানি হয়েছে এখানকার নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে উৎপাদিত ৬ হাজার আনারস। প্রক্রিয়াধীন রয়েছে পাকিস্তান সহ আরো বেশ কয়েকটি দেশে রপ্তানীর। আমের পর আনারস রপ্তানী দেশের কৃষকদের ফল বিদেশে রপ্তানীর আরেকটি সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
মধুপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়,এখানে আনারস চাষাবাদ শুরু হয় ১৯৪২ সালে। মধুপুরের ইদিলপুর গ্রামে প্রথম আনারসের চাষ শুরু করেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য মিজি দয়াময়ী সাংমা। ভারতের মেঘালয় থেকে ৭৫০টি আনারস চারা এনে শুরু করেন চাষাবাদ। সেই থেকে শুরু। বর্তমানে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে ৬ হাজার ৬৩৮ হেক্টর জমিতে আনারসের আবাদ হচ্ছে। এর মধ্যে ক্যালেন্ডার বা জায়ান্ট কিউ জাতের আনারস ৪ হাজার ৩৭৫ হেক্টর, জলডুগি ২ হাজার ২৪৫ হেক্টর এবং এমডি-২ জাতের আনারস ১৮ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় আড়াই লাখ টন আনারস উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশের বাজারে এখানকার উৎপাদিত রসালো মিষ্টি আনারসের খ্যাতি ও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এই আনারসকে আরো উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। এ জন্য তারা কৃষকদের নানা প্রযুক্তির ব্যবহার ও পরার্মশ দিচ্ছেন।
কৃষি বিভাগ বলছে, ‘গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস’ (জিএপি) কর্মসূচির আওতায় মাটি ও পানির পরীক্ষা, প্রয়োজন অনুযায়ী জৈব সার প্রয়োগ এবং রোগবালাই দমনের মাধ্যমে নিরাপদ আনারস উৎপাদনে জোর দেওয়া হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে মধুপুরে চলতি মৌসুমে ১২ একর জমিতে নিরাপদ আনারস উৎপাদন করা হয়েছে। এসব বাগানের আনারস ইতোমধ্যে বিদেশে পাঠানো শুরু হয়েছে।
মধুপুর উপজেলার কৃষক ছানোয়ার হোসেন দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে বিভিন্ন ফল ও ফসল উৎপাদন করছেন। তিনি মধুপুরে পাঁচ একর এবং গাজীপুরের শ্রীপুরে আট একর জমিতে নিরাপদ আনারস চাষ করেছেন। তার বাগানের আনারস জার্মানিতে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। ল্যাব পরীক্ষা ও রপ্তানির অন্যান্য প্রক্রিয়াও এগিয়ে নিয়েছেন তিনি।
ছানোয়ার হোসেন বলেন, ‘নিরাপদ আনারস উৎপাদনে আমরা অনেক দিন ধরে কাজ করছি। এবার জার্মানিতে আনারস পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছি। এটি সফল হলে বিদেশের বাজারে আরও বড় পরিসরে আনারস রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।
সম্প্রতি মধুপুরের কয়েকটি আনারস বাগান পরিদর্শন করেন পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপদ খাদ্য ও গবেষণা মন্ত্রণালয়ের প্ল্যান্ট প্রটেকশন অধিদপ্তরের কীটতত্ত্ববিদ মোহাম্মদ আকীদ মেহদী। তিনি আনারসের উৎপাদন পদ্ধতি, স্বাদ ও মান সম্পর্কে খোঁজ নেন। পরে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তার ভাষ্য, বাংলাদেশে উৎপাদিত আনারস তার কাছে সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যসম্মত মনে হয়েছে। দেশে ফিরে তিনি তার পর্যবেক্ষণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাবেন। এরপর দুই দেশের সরকারের মধ্যে চুক্তি হলে পাকিস্তানে আনারস রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মধুপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা তাজমী নূর রাত্রি বলেন, মধুপুরের আনারসচাষী-ব্যবসায়ীদের মধ্যে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের প্রবণতা দীর্ঘদিনের। কৃষকদের সেই অভ্যাস থেকে বের করে নিরাপদ ও ক্ষতিকর রাসায়নিকমুক্ত আনারস চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। চলতি মৌসুমে জিএপি কর্মসূচির আওতায় ১২ একর জমিতে নিরাপদ আনারস উৎপাদন করা হয়েছে। এর মধ্যে দুবাইসহ কয়েকটি দেশে প্রায় ৬ হাজার আনারস পাঠানো হয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিনিধিদল মধুপুরের আনারসবাগান পরিদর্শন করে উৎপাদন পদ্ধতি ও আনারসের মান যাচাই করেছে। তারা বাগানে ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ও রোগবালাইয়ের উপস্থিতি সম্পর্কেও খোঁজ নিয়েছে। বিদেশের বাজার সম্প্রসারিত হলে কৃষকের পাশাপাশি দেশও লাভবান হবে।