বিশ্ব মানব পাচার প্রতিরোধ দিবস আজ। মানব পাচারের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতি বছর ৩০ জুলাই বিশ্বজুড়ে এ দিবসটি পালিত হয়। জাতিসংঘের উদ্যোগে ২০১৩ সাল থেকে বিশ্ব মানব পাচারবিরোধী দিবস পালন শুরু হয়। এ দিবসের মাধ্যমে মানব পাচারের ভয়াবহতা, শিকারদের দুর্দশা এবং পাচার প্রতিরোধে করণীয় বিষয়গুলো সামনে আনা হয়। বাংলাদেশেও মানব পাচার একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা। বিশেষ করে দরিদ্র, শিক্ষাবঞ্চিত এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এ অপরাধের সবচেয়ে বড় শিকার। চাকরি বা উন্নত জীবনের প্রলোভনে প্রতারণার শিকার হয়ে অনেকেই দেশের বাইরে গিয়ে নিপীড়ন, দাসত্ব, যৌন নির্যাতন কিংবা অমানবিক শ্রমে বাধ্য হচ্ছেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ পাচারের শিকার হচ্ছেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই নারী ও শিশু। বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপগামী রুটগুলো পাচারকারীদের জন্য এখনো সক্রিয়।
সংঘটিত অপরাধের একটা বৈশিষ্ট্য আছে। পৃথিবী যখনই বদলায়, অপরাধীরাও বদলে যায়। বরং অনেক সময় তারা রাষ্ট্রের চেয়েও দ্রুত নিজেদের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। শিল্পবিপ্লবের সময় অপরাধচক্র মানুষের শ্রমকে ব্যবসায় পরিণত করে। বিশ্বায়নের যুগে তারা কাজে লাগিয়েছে উন্মুক্ত সীমান্ত, সস্তা শ্রমবাজার আর অর্থনৈতিক বৈষম্য। আর এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, ক্রিপ্টোকারেন্সি আর ইন্টারনেট-নির্ভর পৃথিবীতে এসে তারা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে সরকার, আইন কিংবা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা যেখানে এখনো লড়াই করছে, সেখানে অপরাধচক্র এরই মধ্যে নতুন ব্যবসায়িক মডেল দাঁড় করিয়ে ফেলেছে।
এ পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়ংকর উদাহরণ হচ্ছে সাইবার প্রতারণাকেন্দ্রিক মানব পাচার। একসময় মানুষকে পাচার করা হতো ইটভাটা, কারখানা, মাছ ধরার ট্রলার কিংবা পতিতালয়ে কাজ করানোর জন্য। এখন মানুষকে পাচার করা হচ্ছে কম্পিউটারের সামনে বসিয়ে অনলাইন প্রতারণা চালানোর জন্য। অর্থাৎ আগে পাচার হতো মানুষের শ্রম আর এখন পাচার হচ্ছে মানুষের মেধা। এ পরিবর্তনটিই মানব পাচারের পুরো চিত্র বদলে দিয়েছে।
আজ একজন তরুণের ভাষাজ্ঞান, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করার ক্ষমতা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চালানোর অভিজ্ঞতা অপরাধচক্রের কাছে একটি মূল্যবান সম্পদ। কারণ এ দক্ষতাগুলো ব্যবহার করেই তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এ কারণে আধুনিক মানব পাচারকে শুধু শ্রম শোষণ বা যৌন শোষণের পুরোনো কাঠামোর মধ্যে ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতার অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যায়। আমাদের একটি অস্বস্তিকর সত্য মেনে নিতে হবে। মানব পাচার এখন আর শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নয়, এর সবচেয়ে আধুনিক রূপটি ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক সংঘটিত অপরাধের মূল ভিত্তিতে পরিণত হচ্ছে। আর এখানেই বিষয়টি শুধু অপরাধের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভূরাজনীতির আলোচনায় প্রবেশ করেছে।
একসময় ভূরাজনীতি মানেই ছিল ভূখণ্ড সামরিক শক্তি আর প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্রের ক্ষমতা নির্ধারিত হচ্ছে আরও কিছু বিষয় দিয়ে। তথ্য, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ এখন জাতীয় শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিগুলোর একটি। সাইবার প্রতারণাভিত্তিক মানব পাচার ঠিক এ চারটি ক্ষেত্রকেই একসঙ্গে আঘাত করছে। আজকের অপরাধচক্র শুধু আইন এড়িয়ে চলতে চায় না, তারা এমন সব সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে যেগুলোর ওপর রাষ্ট্রের শক্তি দাঁড়িয়ে থাকে। তাই এ লড়াই আর শুধু ভুক্তভোগীদের উদ্ধারের লড়াই নয়, এটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সক্ষমতা রক্ষার লড়াইও।
এ বাস্তবতার প্রভাব আদালত বা পুলিশি তদন্তের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছেছে। এটি বদলে দিচ্ছে রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক, কূটনৈতিক অগ্রাধিকার, নিরাপত্তা কৌশল এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ধরন। একসময় ধারণা ছিল, মানব পাচার দুর্বল রাষ্ট্রের সমস্যা, কিন্তু এখন বাস্তবতা ভিন্ন। আজকের দিনে মানব পাচার এমন একটি মাধ্যম হয়ে উঠছে, যার সাহায্যে অরাষ্ট্রীয় অপরাধী গোষ্ঠীগুলো সে ধরনের অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং কৌশলগত শক্তি অর্জন করছে, যা একসময় কেবল রাষ্ট্রের হাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। তাই আজকের স্ক্যাম সেন্টারগুলোর সবচেয়ে বড় উৎপাদন প্রতারণা নয়, তাদের সবচেয়ে বড় উৎপাদন ক্ষমতা।
এখন তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠেছে মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষিত, দক্ষ এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে ভালো ধারণা আছে এমন মানুষ। এ জায়গাতেই আধুনিক মানব পাচার পুরোনো ধারা থেকে পুরোপুরি আলাদা। সরকার সাধারণত আলাদা আলাদা কাঠামোতে কাজ করে। মানব পাচার নিয়ে কাজ করে এক সংস্থা, সাইবার অপরাধ নিয়ে আরেকটি, অর্থ পাচার নিয়ে অন্য একটি, আর অভিবাসন ও কূটনীতি আবার ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। কিন্তু অপরাধচক্র এভাবে কাজ করে না। তারা মানব পাচার, সাইবার প্রতারণা, অর্থ পাচার, প্রযুক্তি, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ককে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে পরিচালনা করে। এটাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
যদি রাষ্ট্রগুলো এখনই এ পরিবর্তন বুঝতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যতের অপরাধচক্র শুধু আইন ভাঙবে না, তারা ধীরে ধীরে সেই শক্তিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে, যেগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষমতা। তাই সাইবার প্রতারণাভিত্তিক মানব পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই আসলে শুধু মানুষ উদ্ধারের লড়াই নয়। এটি মানবসম্পদ রক্ষা করার লড়াই, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার লড়াই, অবৈধ অর্থের বিস্তার ঠেকানোর লড়াই এবং সর্বোপরি এটি নিশ্চিত করার লড়াই যে, মানুষের সক্ষমতা যেন অপরাধীদের অস্ত্র না হয়ে ওঠে। আমরা শুধু মানব পাচারের ধরন বদলাতে দেখছি না, আমরা দেখছি বিশ্বে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে নতুনভাবে নির্ধারিত হচ্ছে।
লেখক: অভিবাসন বিশ্লেষক ও মানব পাচার বিরোধীকর্মী-News-কালবেলা