ঢাকা, বাংলাদেশ ।     বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫৫ পূর্বাহ্ন,  ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
চাকরির নামে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে বাংলাদেশি যুবকরা— মানব পাচারের ভয়াবহ ফাঁদ”।

ভালো বেতনের চাকরির আশায় রাশিয়ায় পাড়ি দিয়ে ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়েছেন একদল বাংলাদেশি যুবক। কনস্ট্রাকশন সাইটে কাজ দেওয়ার কথা বলে তাদের রাশিয়ায় নেওয়া হলেও অভিযোগ উঠেছে, সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তায় দুই বাংলাদেশি যুবক কান্নাজড়িত কণ্ঠে দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন। তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও দেশবাসীর কাছে জরুরি সহযোগিতা চেয়েছেন।

ভিডিওতে এক যুবক তার পাশে থাকা আহত একজনকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, “মাইনুদ্দিন ভাই আমার সঙ্গে আছেন। উনার বাড়ি চাঁদপুর।” ভিডিওতে মাইনুদ্দিনের মাথায় ব্যান্ডেজ দেখা যায়। অপর যুবক নিজের পরিচয় প্রকাশ করেননি।

ভিডিও বার্তায় তারা বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ, আমাদের বাঁচান। যেকোনো সময় আমাদের ফ্রন্টলাইনে পাঠিয়ে দিতে পারে। ড্রোন হামলা, গ্রেনেড হামলা অথবা মাইনে পা পড়ে আমরা যেকোনো সময় মারা যেতে পারি।”

তাদের দাবি, ভালো চাকরির আশায় মোট ৩০ জন বাংলাদেশি একসঙ্গে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। সেখানে পৌঁছানোর পর একটি এজেন্সি তাদের দুই রুশ নাগরিকের কাছে হস্তান্তর করে। তাদের কনস্ট্রাকশন সাইট ও কোম্পানিতে কাজ দেওয়ার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।

ওই যুবকের ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর ৩০ জনকে দুটি ক্যাম্পে ভাগ করে রাখা হয়। এক ক্যাম্পে ১৪ জন এবং অন্য ক্যাম্পে ১৬ জনকে রাখা হয়। এরপর মাত্র তিন থেকে চার দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঁচ-ছয়জন করে তাদের ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয়।

যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে থাকা অনেকেই আর বেঁচে নেই বলে দাবি করেছেন ভিডিওতে থাকা যুবকেরা। তাদের ভাষ্য, ৩০ জন বাংলাদেশির মধ্যে ইতোমধ্যে ১২ জন মারা গেছেন। বর্তমানে চারজন জীবিত থাকলেও তারাও আহত অবস্থায় রয়েছেন।

ভিডিওতে পাশে থাকা মাইনুদ্দিনের মাথায় ড্রোন হামলায় আঘাত লাগার কথা জানানো হয়। অন্য যুবক জানান, তার বাম হাতেও আঘাত রয়েছে। আহত অবস্থায়ও তাদের যেকোনো সময় আবার সম্মুখযুদ্ধে পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে এক যুবক বলেন, “এভাবে মৃত্যু চাই না আমরা। আমরা চাই আমাদের মৃত্যুর পরে আমাদের জানাজা হোক। এভাবে শিয়াল-কুকুরের মতো আমরা মরতে চাই না।”

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও দালালচক্রের মাধ্যমে উচ্চ বেতন, সহজ চাকরি কিংবা দ্রুত বিদেশ যাওয়ার প্রলোভনে তরুণদের রাশিয়ায় পাঠানোর ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে চাকরির ক্ষেত্রে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান, কাজের ধরন, ভিসার প্রকৃতি এবং চুক্তিপত্র যাচাই না করে কোনো দালাল বা এজেন্সির কথায় বিদেশে পাড়ি দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে যুদ্ধকবলিত বা সামরিক সংঘাতপূর্ণ কোনো দেশে চাকরির প্রস্তাব পেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা জরুরি।

রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে থাকা আহত বাংলাদেশি যুবকদের দাবিগুলো যাচাই করে তাদের প্রকৃত অবস্থান শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি উঠেছে।

একই সঙ্গে বিদেশে চাকরির নামে মানব পাচারের সম্ভাব্য ফাঁদ থেকে তরুণদের রক্ষা করতে দালাল ও প্রতারণাকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং বিদেশগামী কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরির প্রয়োজন রয়েছে।

শুধু উচ্চ বেতন বা দ্রুত বিদেশ যাওয়ার প্রলোভনে কোনো এজেন্টের কথায় রাশিয়া বা অন্য কোনো যুদ্ধকবলিত দেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। চাকরির অফার, নিয়োগদাতা, ভিসা, কর্মচুক্তি ও কাজের প্রকৃতি সরকারি অনুমোদিত মাধ্যমে যাচাই করেই বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া নিরাপদ।

Copyright © janatarkolom.com All Right Reserved.


Developed By Monoputo